রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ০৩:৩৬ অপরাহ্ন

নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে পোশাক শ্রমিকরা যৌনকর্মে বাধ্য হচ্ছেন

ডেইলী বেঙ্গল গেজেট রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৩ ৪:৫৩ pm

প্রতিরাতে ছোট্ট একটি কক্ষের ঠান্ডা মেঝেতে রাত কাটাতে হয় রুবি রফিককে (ছদ্মনাম)। বেশিরভাগ সময় তিনি জেগেই থাকেন। আর জেগে জেগে ভাবেন শুধু কীভাবে তার পরিবার এই শীতের সময়টা পার করবেন। পাশে রাখা একটি দাতব্য সংস্থার দেয়া কম্বল গায়ে জড়িয়ে শুয়ে আছে তার ১৩ বছরের মেয়ে মায়া। দুই সন্তানের মা রুবি প্রতি রাতে তার সন্তানদের ঘুমিয়ে পড়ার অপেক্ষায় থাকেন। আর তারা ঘুমিয়ে পড়লেই গায়ে একটি শাল জড়িয়ে বাসা থেকে বের হয়ে কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত বাজারে চলে আসেন। সেখানে গিয়ে কোনো পুরুষ তার দিকে এগিয়ে আসবে, সে আশায় বসে থাকেন তিনি। রুবি রফিক বলেন, তাদেরকে নিজের বিষয়ে কিছু বলতে হয় না। আত্মসম্মান আছে এমন কোনো নারী এত রাতে রাস্তায় থাকে না।

দিনের পোশাক শ্রমিক হিসেবে দিনে কাজ করেন তিনি। কিন্তু মূল্যস্ফীতির উর্ধ্বগতিতে জীবনযাপনের ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকায় রাতের বেলা যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই রুবির কাছে। আগে যদিও এত খারাপ অবস্থা ছিল না তার বলে জানান।

আগে সাধারণত এক বেলা না খেলেই কিংবা মায়ার লাঞ্চবক্সের খাবার একটু কমিয়ে দিয়েই চালিয়ে নিতে পারতেন তিনি। কিন্তু তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও অবনমিত হয়েছে।

রুবির ১৬ বছরের ছেলে সাকিব ক্ষুধার্ত হয়ে চুরি করা শুরু করেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে রুবির পক্ষে বাসা ভাড়া দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি ঋণ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই ঋণ পরিশোধেও তাকে আবার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। গত বছর থেকে তার অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সঙ্গে জড়িত ৪০ লাখ শ্রমিক যারা এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তাদের একজন এই রুবি। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। অথচ উৎপাদনের প্রাচুর্যতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এখনও বিশ্বের সর্বনিম্ন মজুরি বিরাজমান। ২০১৮ সাল থেকে প্রতি মাসে মাত্র আট হাজার টাকা বা ৫৭ পাউন্ড বেতন প্রচলিত এই শ্রমিকদের জন্য।

গত নভেম্বরে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য দর কষাকষির সময় রাজধানী জুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ন্যূনতম বেতন বাড়িয়ে সরকার মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু এরপরেও বিক্ষোভ চলমান রাখে আন্দোলনরত শ্রমিকেরা। পরবর্তীতে তা সহিংস আকার ধারণ করে। শ্রমিকরা বলছেন সরকার নির্ধারিত এই মজুরি তাদের চাওয়া ২৩ হাজার টাকা থেকে অনেক কম। তাদের মৌলিক জীবনযাত্রার খরচ মেটানোসহ পরিবার-পরিজনদের অনাহার থেকে বাঁচাতে এই মজুরি একান্ত প্রয়োজন তাদের।

গত মাসে যুক্তরাজ্যের হাই স্ট্রিটের জন্য পোশাক তৈরি করা এই বাংলাদেশি শ্রমিকরা তাদের বাচ্চাদের খাওয়ানোর চুরির বিকল্প উপায় নেই বলে এক আক্ষেপে জানান। রুবি বর্তমানে যে কারখানায় কাজ করছেন সেটি টেসকো, মাতালান এবং নেক্সটসহ বড় বড় বৃটিশ ব্র্যান্ডগুলির কাছে পোশাক বিক্রি করে থাকে। বড়দিন উপলক্ষ্যে তারা ‘সান্তা’স লিটল হেল্পার’ লেখা উৎসব জাম্পার তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন। রুবি নিজে কখনও সিনেমাটি দেখেননি যদিও কিন্তু তার হাস্যোজ্জ্বল মুখটি তার কাছে মজার লেগেছে।

তবে রুবির কাছে জীবন আনন্দের নয়। সপ্তাহে সাত দিন টানা ১০ ঘণ্টা করে কাজ করেও জীবনের প্রয়োজন মেটাতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি সপ্তাহে প্রায় ১৫ পাউন্ড উপার্জন করেন। হাজার হাজার জাম্পারের মধ্যে মাত্র একটির খুচরা মূল্যের চেয়েও তার ব্যক্তি আয় কম। যদিও আশা ছিল যে, নতুন ন্যূনতম মজুরি ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। কিন্তু এখনও তা পরিশোধ করা হয়নি।

তাদের অবস্থা ক্রমশই ভয়াবহ হয়ে উঠলে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই রুবির মতো অনেককেই বেঁচে থাকার লড়াইয়ে যৌনকর্ম বেছে নিতে বাধ্য হতে হচ্ছে। মাস কয়েক আগে একজন লোক রুবির কাছে ৫০০ টাকার প্রস্তাব দেয়। ভাবলেন তিনি একজন ক্লায়েন্ট থেকে যা পান এই টাকা তার দ্বিগুণ। তাই রুবি ভাবেন, আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা যাবে। ক্লায়েন্টের গাড়িতে ওঠার আগে ওই টাকা তিনি কাছের এক দোকানদারের কাছে রেখে যান। কিন্তু যখন তিনি ওই ব্যক্তির বাড়িতে পৌঁছান, দেখেন সেখানে আরও ১০ জন তার অপেক্ষায় রয়েছে।

তিনি বলেন, আমি তাৎক্ষণিকভাবে তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও তারা দরজা বন্ধ করে দেয়। আমাকে গালি দিতে থাকে। একপর্যায়ে আমি কাঁদতে শুরু করলে যে লোকটি আমাকে সেখানে নিয়ে এসেছিলেন, তিনি আমাকে তার দেয়া টাকা ফেরত দিয়ে চলে যাওয়ার অনুমতি দেন। কিন্তু আমি তাদের জানাই যে, আমার কাছে ওই টাকা এখন নেই। তিনি তখন আমার শরীরে ওই টাকা খুঁজতে থাকেন।

রুবি জানান, ‘’তার কাছে টাকা না পেয়ে তাকে বেদম প্রহার শুরু করেন ওই লোক। তারা আমার মাথা টেবিলে চেপে ধরেন এবং এক পর্যায়ে বাইরে ফেলে দেন আর সেসময় বলতে থাকেন- আমি কোনো কাজে না। আমি রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকি।‘’

অশ্রুসিক্তনয়নে তিনি বলছিলেন, ‘’ভেবেছিলাম সেদিন আমি মারা যাব। কারণ দৈত্যের মত লোকটা আমাকে সজোরে লাথি মেরেছিল। তাই আমি ভাবতে থাকি যে, আমি মারা গেলে আমার সন্তানদের কী হবে? আমার মেয়ের পরিণতিও কি আমারই মতন হবে? আমি এর চেয়ে খারাপ কিছু কল্পনা করতে পারি না।‘’

এমন ঘটনার পরেও রুবি যৌন কাজ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর বিকল্প দেখছিলেন না বলে জানান। তিনি জানান, ‘’সকল পণ্যের দাম এত বেড়েছে যে এখন ডিম কিনে খাওয়াটাও বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন জামাকাপড় কেনা বহুদূরের কথা, আমি গত পাঁচ বছর ধরে এই একই জাম্পার শীতে চালিয়ে নিচ্ছি। এটি একসময় সুন্দর হলুদ রঙের ছিল। আর এখন এটি কাদার মত বাদামী হয়ে গেছে।‘’

প্রতিদিন কাজের পর রুবি মরিয়া হয়ে অপেক্ষায় থাকেন যদি ওভারটাইম শিফট পাওয়া যায়। কিন্তু এটা সবসময় সম্ভব নয়। তাই রুবি নতুন ক্লায়েন্টের সন্ধানে বাজারের দিকে চলে আসেন বলে জানান। রুবি সাধারণত প্রতি খদ্দের থেকে ২০০ টাকা (যেখানে নতুন নির্ধারিত নূন্যতম মজুরি ঘন্টা প্রতি ৬৫ টাকা) করে নিয়ে থাকেন। দিনে দুই থেকে তিনজনকে তার সেবা দিতে হয়। আর এই অর্থ দিয়ে খাবার কিনে থাকেন। আর কারখানা থেকে যা আয় করেন তার বেশিরভাগই খরচ হয় ভাড়া, বিল এবং সন্তানদের পড়ালেখার পেছনে। রুবি বলেন, যখন আমি বাড়ি ফিরে আসি তখন সাধারণত মধ্যরাত হয়ে যায়। শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত বোধ করি। আমি জানি না আমার শরীর আর কতটা ধকল নিতে পারবে। আমি শুধু আমার সন্তানদের ভবিষ্যত দেখার অপেক্ষায় থাকি। আমার মেয়ে মায়া ডাক্তার হতে চায়। সে এমন সব স্বপ্ন দেখে যা আমার কল্পনার মধ্যেও নেই। আর মা হিসেবে আমার একটাই কাজ- সন্তানের স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়া।

প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে, রুবি হাত উষ্ণ রাখতে কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালান। মাঝে মাঝে তিনি নীরবে গুনগুন করে গাইতে গাইতে ভাবেন, তার বানানো জাম্পারগুলো গন্তব্যে পৌঁছেছে কিনা।

তিনি বলেন, কেউ যদি বাংলাদেশে তৈরি ক্রিসমাস জাম্পার পরেন তাহলে তার জানা উচিত যে, আমার মতো (রুবি) কর্মীরা সেই পোশাকগুলি তৈরি করেন যা তাদেরকে আনন্দ দেয়। আর এর বিনিময়ে আমরা সীমাহীন দুঃখের জীবন নিয়ে বেঁচে থাকি। আমরাও মানুষ, আমরা যন্ত্র নই। আমরাও কি একটু আনন্দের যোগ্য হতে পারিনা?

এ নিয়ে টেসকোর একজন মুখপাত্র বলেন, টেসকো ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধিকে সমর্থন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে করে শ্রমিকদের ও তাদের পরিবারের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে সহায়ক হয়।

টেসকোর মুখপাত্র বলেন, “আমাদের পক্ষ হতে পণ্য ক্রয়ের সময় আমরা দায়িত্বশীল থাকি। আমাদের গ্রাহকদের জন্য মূল্য সরবরাহের সময় আমাদের সরবরাহ শৃঙ্খলে থাকা সকল কর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।‘’

সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান

আরো

© All rights reserved © 2023-2024 dailybengalgazette

Developer Design Host BD