রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ০৪:৫৪ পূর্বাহ্ন

রাসেলস ভাইপারসহ অনেক বিষধর সাপের অ্যান্টিভেনম দেশে নেই

ডেইলী বেঙ্গল গেজেট রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৩ ২:৪৮ am

বর্ষাকালে গ্রামাঞ্চলের মানুষের মধ্যে আতঙ্কের বিষয় হয়ে ওঠে সাপের কামড়। বিষধর সাপের দংশনে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২২ সালের সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় চার লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়, যার মধ্যে সাড়ে সাত হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। বিষধর সাপ কাটার পর সাপের কামড়ের ওষুধ অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ জরুরি হয়ে যায়। অন্যথায় রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। রোগীর শরীরে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ সবচেয়ে জরুরি হলেও দেশের হাসপাতালগুলোতে এখনও অত্যাবশ্যকীয় এই ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই।

অ্যান্টিভেনম বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় এসেনশিয়াল ড্রাগ বা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাভুক্ত হলেও বাংলাদেশে সাপের কামড়ের বিষয়টি এখনও অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর বা বিষ নিষ্ক্রিয় করতে পারে এমন উপাদানকে অ্যান্টিভেনম বলা হয়।

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে অর্থাৎ মে, জুন এবং জুলাই -এই তিন মাস সাপের কামড় এবং এর কারণে মৃত্যুর ঘটনা বেশি দেখা যায়। কেননা অতি বৃষ্টিপাতের কারণে সাপের আবাসস্থল বা গর্তগুলো ডুবে যায়। তখন সেগুলো উঁচু জায়গায়, অনেক সময় মানুষের বসতবাড়ির আশপাশে বিচরণ করে। তাই একটু অসাবধানে থাকলেই সাপে কাটার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। খবর বিবিসি বাংলা।

অ্যান্টিভেনম কখন প্রয়োজন?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ টক্সিকোলজি সোসাইটির সভাপতি এম এ ফয়েজ সাপের দংশন ও এর চিকিৎসা নিয়ে বই লিখেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, গোখরো সাপের দংশনের গড় ৮ ঘণ্টা পর, কেউটে সাপের দংশনের গড় ১৮ ঘণ্টা পর ও চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার) সাপের দংশনের গড় ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন পর রোগীর মৃত্যু হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সময়সীমার মধ্যে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা জরুরি।

সাপের কামড় বা দংশনের পরে, দ্রুত অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন দিলে, অ্যান্টিভেনমের অ্যান্টিবডিগুলি বিষকে নিষ্ক্রিয় করে। যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেঁচে যায়।

সাপ কামড়ানোর পর একজন রোগীকে ১০টি করে অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন দিতে হয়। ১০টি ভায়াল মিলে একটি ডোজ হয়ে থাকে।

বিষের পরিমাণ এবং বিষাক্ততার মাত্রা বেশী হলে সাপে কামড়ানো ব্যক্তির উপর এক বা একাধিক ডোজ অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করার প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসকরা মূলত রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে তার বিভিন্ন লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসকরা দিয়ে থাকেন। এসব লক্ষণের মধ্যে রয়েছে, শরীর অসাড় হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরানো, বুক ধরফর করা, শ্বাসকষ্ট, অসংগত ব্যবহার, ক্ষণিকের জন্য রক্তচাপ কমা।

বিষধর সাপের অ্যান্টিভেনম সাপ ভেদে যেমন আলাদা হয়ে থাকে তেমনি একই অ্যান্টিভেনমে কয়েক ধরণের বিষধর সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করা যায়। এই কার্যকারিতার উপর ভিত্তি করে অ্যান্টিভেনম দুই রকম হয়ে থাকে।

মনোভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম – যে অ্যান্টিভেনমগুলো শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির সাপের বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর এবং পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম – যে অ্যান্টিভেনমগুলো একাধিক প্রজাতির সাপের বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর।

বাংলাদেশ টক্সিকোলজি সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে যে অ্যান্টিভেনম আনা হয়, সেটি মূলত চারটি সাপের বিষের একটি ‘ককটেল’ বা মিশ্রণ, যা কিছু সাপের দংশন নিরাময়ে কাজ করে। বাকি ক্ষেত্রে সেগুলো আংশিক কাজ করে। অনেক সময় সাপের কামড়ের ধরণ দেখে, আবার রক্ত পরীক্ষা করে চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন যে এটি বিষাক্ত সাপে কামড়েছে নাকি বিষহীন সাপে কামড়।

তারপরও সাপে কামড়ানোর সময় সেটি কি প্রজাতির সাপ সেটি দেখতে কেমন তা লক্ষ্য করতে বা ছবি তুলে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। সাপের এই বর্ণনা পরবর্তীতে চিকিৎসা পরিকল্পনায় সাহায্য করতে পারে।

দেশে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম নেই

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে বাংলাদেশে প্রতিবছর অনেকে বিষধর সাপের কামড়ে মারা যান শুধুমাত্র সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়া বিশেষ করে হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম না থাকার কারণে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক ফয়েজ জানিয়েছেন, এর বড় কারণ বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে কোনও অ্যান্টিভেনম তৈরি হয় না। দেশে সাপের কামড়ের চিকিৎসায় এখন যেসব অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা হয় তা ভারত থেকে আসে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে, সাপের কামড়ের রোগীর চিকিৎসার জন্য স্থানীয় সাপ থেকে অ্যান্টিভেনম তৈরি হলে তা সবচেয়ে কার্যকর হয়। অন্য দেশের অ্যান্টিভেনম এই দেশে শতভাগ কার্যকর নাও হতে পারে। কারণ, একেক দেশের সাপের প্রকৃতি একেক রকম।

ভারতে যেসব সাপ থেকে বিষ সংগ্রহ করা হয়, সেগুলোর পুরোপুরি বাংলাদেশের সাপের সঙ্গে মেলে না। অথচ বছরের পর বছর ধরে ভারতের অ্যান্টিভেনম দিয়েই বাংলাদেশের সাপের কামড়ের রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অ্যান্টিভেনমকে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বললেও বাংলাদেশে এখনও নিজেদের সাপের বিষের অ্যান্টিভেনম বানাতে পারাকে ব্যর্থতা বলছেন ফয়েজ।

এ ব্যাপারে ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোর মুনাফা কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনাকে দায়ী করছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র রোবেদ আমিন বলেন, “বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো এতো ওষুধ তৈরি করে, কিন্তু তারা অ্যান্টিভেনম বানায় না। কারণ এখানে লাভ কম। সাপে কাটে গরিব মানুষদের।”

অ্যান্টিভেনম প্রয়োগে ভয়?

সরকারি নিয়মে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার সিভিল সার্জনদের তাদের চাহিদার বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানানোর কথা। সেই চাহিদার ভিত্তিতে জেলা সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সেখান থেকে উপজেলার সরকারি হাসপাতালগুলোয় প্রয়োজন এবং চাহিদা অনুযায়ী অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করার কথা। এসব হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীদের বিনামূল্যে অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন দেয়ার কথা।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় সরকারিভাবে অ্যান্টিভেনমের যথেষ্ট সরবরাহ নেই। যেগুলো আছে সেগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ। আবার মেয়াদ সম্পন্ন অ্যান্টিভেনম থাকা সত্ত্বেও অনেক চিকিৎসক দিতে সাহস পান না।

বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকরা নিরাপত্তাজনিত কারণে অ্যান্টিভেনম প্রদানে অনেক সময় বিরত থাকেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের ১০ থেকে ৬০ মিনিট পরে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে, কাশি, চুলকানি, লাল লাল চাক খাওয়া, জ্বর আসা, বুক ধরফর করা, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া, মাথাব্যথা। এছাড়া মারাত্মক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে রক্তচাপ কমে যাওয়া শ্বাসকষ্ট হওয়া শ্বাসনালী ফুলে যাওয়া।

এসব পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় রোগী চিকিৎসকদের ওপর চড়াও হতে পারেন এমন ভয়েও থাকেন তারা। আবার সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে অ্যান্টিভেনম না পেয়ে অনেক রোগীকে হাসপাতালের বাইরে থেকে চড়া দামে কিনতে হয়।

সরকারিভাবেই সরকার ভারত থেকে ১০ ভায়ালের এক ডোজ অ্যান্টিভেনম ১৪ হাজার টাকায় কেনে। সেটি রোগীরা বাইরে থেকে কিনতে গেলে আরও বেশি দাম পড়ে। যা সাপে কাটা অনেক রোগীর পক্ষেই বহন করা সম্ভব না।

আরো

© All rights reserved © 2023-2024 dailybengalgazette

Developer Design Host BD